ক বি- প্রা ব ন্ধি ক মা হ মু দ কা মা ল
কবি মাহমুদ কামাল
কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ বন্ধু জাহাঙ্গীর ফিরোজ
কবি-প্রাবন্ধিক মাহমুদ কামাল
ব্যক্তি জাহাঙ্গীর ফিরোজ এবং কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ একে অপরের পরিপূরক। তাঁর ব্যক্তিসত্তা কবিতায় বিলীন হয় নিপুণ বাক বিন্যাসে। তেজদীপ্ত পংক্তি রচনা করে সত্তর দশকের এই কবি নিজেকে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন।ব্যক্তি জীবনে নির্মম সত্য উচ্চারণে তিনি নন্দিত এবং নিন্দিত। তাঁর কবিতা সমসাময়িকতার পরিমন্ডলে একেবারেই আলাদা। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো উচ্চারণে তিনি যে রসায়নটি তৈরি করেন তার দ্রড়িষ্ঠ অর্থদ্যোতনা পাঠকমনকেও দ্রবিভূত করে। কবির মানসলোকে মানুষই উঠে আসে নানা আঙ্গিকে। মানবতাবোধে উজ্জীবিত কবিতা রচনায় তিনি স্পষ্টবাদী। যে কোনও জায়গায় যে কোনও মুহূর্তে তিনি কবিতা রচনা করতে পারেন। কবির জন্ম ১৯৫৫ সালের ৬ই এপ্রিল টাঙ্গাইলের বিরপুশিয়া গ্রামে। বাবার কর্মসূত্রে নানা জায়গায় থেকেছেন। জন্ম তারিখ অনুযায়ী তিনি আমার দুই বছরের বড়ো। কিন্তু এসএসসির হিসেবে পাঁচ বছরের। কিন্তু সম্পর্কটা আত্মিক। নানা ঘটনার সাথে আমরা জড়িত। এখানে তার সামান্যই আলোকপাত হবে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ এম এ পাশ করে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। নানা কাগজ ঘুরে প্রেস ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে থেকে অবসরে গেছেন। শুরুতেই বলেছি তার কবিতা এবং জীবন যাপন কারও সাথে মেলানো যাবে না। চলতে ফিরতে অসংখ্য ঘটনার জন্ম দিয়েছেন যা এখন সুখস্মৃতি হিসেবে মনকে আলোড়িত করে আবার কষ্টও দেয়। আমাদের অরণি কাগজের প্রথম সংখ্যার তিনি সম্পাদক ছিলেন। তখন ট্রেডল মেশিনের যুগ। ১৯৭৬ সাল। দুই ফর্মার পত্রিকা। লেখা ও মুদ্রণ সৌকর্যে সেই সময়ে টিনসেল এই শহরের সাহিত্যমোদীদের কাছে আলোড়ন তুলেছিল। ঐ একটি সংখ্যাই তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। এর পর ঢাকা চলে যান। টাঙ্গাইল থাকাকালীন সাহিত্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে তার সক্রিয় কার্যক্রম আমাদের নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। কখনো নেতৃত্ব দিয়েছেন কখনো উপদেশ। সেই সময়ে অর্থ্যাৎ ১৯৭৮ সালে টাঙ্গাইলের স্টেডিয়ামে আমরা দুইদিন ব্য্যপি সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করি। জাহাঙ্গীর ফিরোজ ছিলেন সম্পাদক- মন্ডলীর এক নম্বরে। এসেছিলেন বাসবোঝাই কবি। দুটো প্রাইভেট কারও ছিল। তখন টাঙ্গাইলে ভালো কোনও হোটেল ছিল না।সবেধন নিলমণি হোটেল আপ্যায়ন এবং স্টেডিয়ামের ঢালাও বিছানা। তখন একজিবিশন চলছিল। কয়েকজন ছিলেন সার্কিট হাউজে।তো, প্রায় একশ কবির হ্যাপা সামলাতে আমরা ক্লান্ত। মফস্বল শহরে পিকনিকে এসেছেন এ রকম মন্তব্য কানে আসে তরুণ কবিদের কণ্ঠ থেকে। রাগী যুবক তখনো শান্ত। কিন্তু রাত দশটায় যদি কারও লুঙ্গির প্রয়োজন হয় এবং তা না পেয়ে সেই কবি যখন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তখন তার চেয়ে আরও উত্তোজিত হয়ে ওঠেন আমাদের রাগী যুবক জাহাঙ্গীর ফিরোজ।এত রাতে সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আর বাড়ির বাইরে গেলে সবাই প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন এটাই স্বাভাবিক। জাহাঙ্গীর ফিরোজ কি বলেছিলেন এখানে তা উহ্য থাক। তবে সে দিন থেকে সেই ক্ষিপ্ত কবির নাম হয়ে গেল লুঙ্গি আজাদ।
আমরা আয়োজন করেছি ‘অরণি’র উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা অনুষ্ঠান। দশ টাকা এবং পাঁচ টাকা ছিল প্রবেশপত্রের মূল্য।১৯৮০ সালের ৮ই জুন টাঙ্গাইলের ভাসানী হলে অসংখ্য শ্রোতা-দর্শক উপস্থিত ছিলেন।প্রধান অতিথি কবি শামসুর রাহমান তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘অরণি একটি ইতিহাস তৈরি করল’। ইতিহাস তো বটেই। এই ইতিহাসের অন্যতম অংশীদার কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ। আমরা অরণির একটি সংখ্যা সজিয়েছি তাকে নিয়েই। সংখ্যাটি এখন দুষ্প্রাপ্য।
আমরা একসঙ্গে হেঁটেছি বহুদিন। এক রাগী যুবকের সাথে চলেছি কিন্তু তালশাঁসের মতোই তার হৃদয়। সোজাসাপ্টা কথা বলার কারণে অনেকের কাছেই তিনি
অপ্রিয়।কবির বেহিসাবী জীবনের রাশ টেনে ধরে এখনো অক্লান্ত তার প্রিয়তমা স্ত্রী শিরীন আখতার রুমা। জাহাঙ্গীর ফিরোজ কথা বলতে ভালোবাসেন। কথা শুরু করলে কখন থামতে হবে তা তিনি খেয়াল করতেন না। উচ্চকণ্ঠ তার স্বভাবজাত। অসম্ভব স্মৃতি শক্তি। একনাগাড়ে স্মৃতি থেকে কবিতা বলতে পারেন। তর্ক প্রিয়।সাহিত্যের সব শাখার আলোচনাতেই তিনি আড্ডার মধ্যমনি। উচ্চকণ্ঠের কারণে প্রায়ই গলা বসে যেত। ধীরে ধীরে সেখানে বাসা বাঁধে জীবানু। গলায় মেজর অপারেশন করে এখন তিনি শয্যাশায়ী।কথা বলা একেবারেই নিষেধ। আনন্দের বিষয় ক্রমেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। অসংখ্য কবিতা লিখেছেন, স্বভাবজাত কারণে তার এক চতুর্থাংশই হারিয়ে ফেলেছেন। বাকি যা আছে তা থেকে অন্তত কুড়িটি কবিতাগ্রন্থ হতে পারে। কিন্তু এ যাবত তাঁর গ্রন্থ বেরিয়েছে কবিতাসমগ্রসহ মাত্র এগারটি।। এগুলো হচ্ছে: বদ্ধ মাতাল রোদে (১৯৮৭, ২য় মুদ্রণ ২০০৩ ), যে ছিল প্রাণের জরুরি ( ১৯৯৭ ), চাকরিজীবীদের কোন
স্পার্টাকাস নেই ( ২০০০ ), অনুবিশ্বের মেঘমালা(২০০৩ ), ছেঁড়া টুকরো মেঘ ( ২০০৫ ), লালনের পাখি উড়ে যায় (২০০৬ ) মৌরি বনের বাতাস ( ২০০৮ ) সাগরের গর্জন থেকে নুন রক্তে আসিল ( ২০১২ ), সন্ন্যাসীর বাঁশির আগুন ( ২০১৯ ) এবং ধাঁধাময় জগৎ সংসারে( ২০২০ )। ২০১৫ সালে বেরিয়েছে ‘কবিতা সমগ্র।’ প্রথম কাব্য থেকে দ্বিতীয়টি বের হতে সময় লেগেছে দশ বছর। জাহাঙ্গীর ফিরোজ সত্তর দশকের প্রথম দিকের কবি। বোধকরি উদাসীনতার জন্যই তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা হাতে গোনা। জাহাঙ্গীর ফিরোজ সত্তর দশকের স্বাতন্ত্র্য ধারার কবি। তার প্রায় কবিতাই বিশ্লেষণযোগ্য। এখানে আলোচনার জন্য বেছে নিয়েছি মাত্র ছয়টি কবিতা। ১. অন্ধকার থেকে অন্ধকার বেয়ে বেয়ে ল্যান্সডাউনের মোড়ে চলে আসি ট্রাম লাইনের পাশে জীবনানন্দের রক্তাক্ত দেহ, বাংলা কবিতা, আকন্দ ধুন্দুলের বনে তীব্র জ্বলে উঠছে বাতি ( সাম্প্রতিক কবিতার প্রতি:বদ্ধমাতাল রোদে: পৃ-৩২ ) ২. আমি সকল ইঙ্গিতের অর্থ বুঝি না তুমি হাত নাড়লেই জন্ম, জন্মের আয়োজন, সুখের আড়ালে? পঙ্গুরাও বাঁচতে চায় জরা ব্যাধি থকথকে কফ, জীবনের কানাগলি তবুও সে বলে: না-না বিলুপ্ত হ’ব না। ( অস্তিত্ব: বদ্ধমাতাল রোদে: পৃ-৪৩ ) ৩. একটি চিতা বদ্ধমাতাল রোদে চিত্রিত এক হরিণ খুঁজে ফেরে একটি চিতা মৃগনাভির ঘ্রাণে নিদ্রাভুলে জনারণ্যে ঘোরে, ( চিতা: বদ্ধমাতাল রোদে: পৃ-৬৩ ) সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার গতি ও প্রকৃতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গবেষকের কাজ। কবি এখানে গবেষকের উৎস সন্ধানের জায়গা করে দিয়েছেন। চর্যাগীতিকার কাহ্নপা থেকে জীবনানন্দ পর্যন্ত কবিতার বাঁক কোথায় বদল হল তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে কবি বলে ওঠেন,‘আমি কেন্দ্রবিন্দু অব্দি খুঁজে যাবো/ আগুন ও লাভায় হবে আমাদের প্রভাত।’ জীবনানন্দ পরবর্তী অনেক কবিই জীবনানন্দ আক্রান্ত। বেশ কিছু শক্তিমান কবি প্রাথমিক পর্যায়ে জীবনানন্দ তাড়িত হলেও পরবর্তী সময়ে কবিতার সামগ্রিকতায় নিজেকে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। যারা পারেননি তাদের অস্তিত্ব এখনও জীবনানন্দ গহ্বরেই। জাহাঙ্গীর ফিরোজের ‘আগুন ও লাভায় হবে আমাদের আর একটি প্রভাত’পংক্তিটি প্রমাণ করে কবি নিজেও জীবনানন্দ বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে চান। ‘অস্তিত্ব’ কবিতাটির অর্থ নামেই প্রকাশ। কবি সকল ইঙ্গিতের অর্থ বোঝেন না এটি তার সরল স্বীকারোক্তি কিন্তু হাত নাড়লেই জন্ম ও জন্মের আয়োজনটা বোঝেন। এই চিত্রকল্পটি আমাদের খুবই চেনা এবং বলাবাহুল্য তা অর্থবহ। যে কোনও প্রাণের অস্তিত্ব তা যত ক্ষীণই হোক না কেন প্রাণটি যার তার কাছে নিরাভরণ নয়। বেঁচে থাকার তাগিদেই যার যার অবস্থান থেকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি চমৎকার ছবি হয়ে উঠেছে উপরোক্ত কবিতাটি।
‘বদ্ধমাতাল রোদে’ কাব্যের শেষ কবিতা ‘চিতা’। চিতার ক্ষিপ্রতায় কবি নিজেকে দাঁড় করিয়ে তার ভরা তারুণ্যের প্রেমের আকুতি প্রকাশ করেছেন উদ্ধৃত কবিতাটিতে। শুরুতেই ব্যক্তি জাহাঙ্গীর ফিরোজ সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে ‘চিতা’ কবিতাটি তারই আদল বললে ভুল হবে না।
৪.
চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টকাস নেই চাকরিজীবীদের হাত ও কলমের মাঝে তৃতীয় পুরুষ যখন আমার হাত ও কলমের মাঝে কোন তৃতীয় পুরুষ থাকে না তখন আমি কবি। (স্পার্টাকাস:চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টাকাস নেই:পৃ-৯) ৫. সব বুনোফুল একটিও নেই বনে স্মৃতির গভীরে বন মোরগের ডাকে একটি কুটিরে বনের গভীরে একা কুঞ্জলতার বেড়াগুলো তার ঢাকা (বুনোফুল:চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টকাস নেই:পৃ-৩২ ) ৬. জীব ও জীবনের মর্মমূলে শুধু কি পরার্থপরতা চিন্তার অদ্ভুত ছবি নিয়ে দাবা খেলা শেষ হলে পুনর্বার মগজের ঝড়ে বিজয়ের রোডম্যাপ। সেও পরার্থপরতা। ( পরার্থপরতা: মৌরি বনের বাতাস:পৃ-১০ ) জাহাঙ্গীর ফিরোজের বেশ কিছু জনপ্রিয় কবিতার একটি ‘স্পার্টাকাস’।দাসত্ব থেকে জীবন দিতে হয়েছে স্পার্টাকাসের। এই কিংবদন্তীর বয়স দু’হাজার বছরের উপরে। দাসত্বের আছে নানা সংজ্ঞা। বিজ্ঞানের উন্নতির ধারাবাহিকতার মধ্যে ‘দাসত্ব’ এখনো নানা মাত্রিকতায় ব্যধির মতোই পরিদৃষ্ট। জাহাঙ্গীর ফিরোজ চাকুরিকে দাসত্বের সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য অকষ্টকল্পনার মতোই সমাজবাস্তবতা পায়। পরক্ষণেই নিজের স্বকীয়তাকে তিনি এভাবেই আলাদা করেছেন, ‘যখন আমার হাত ও কলমের মাঝে কোন তৃতীয় পুরুষ থাকে না/ তখন আমি কবি।’ আমাদের সকল ক্ষেত্রেই তৃতীয় পুরুষটি বিরাট বাঁধা হিসেবেই কাজ করে। স্পার্টাকাস এ কারণে সমসাময়িক চেতনায় বিপ্লবী পুরুষ। প্রকৃতি ধ্বংসের বর্তমান রূপ ‘বুনোফুল’ কবিতাটি। নির্বিচারে প্রকৃতি নিধনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমরা ইতোমধ্যে দেখতে শুরু করেছি। মানুষ ও প্রকৃতিকে আমরা সমার্থক হিসেবেই বিবেচনা করি। তবে প্রকৃতির
জন্য মানুষের প্রয়োজন না হলেও মানুষের জন্য প্রকৃতি জরুরি। আর, সমার্থক এ জন্যই, মানুষও প্রকৃতি হয়ে ওঠে তার সজীবতায় তার কার্যকারণের অর্থময়তায়। এই ধ্বংস প্রকৃতির কথাই উঠে এসেছে ‘বুনোফুল’ কবিতায়। বনে যদি বুনোফুলের অস্তিত্ব না থাকে তাহলে সে বনের চেহারা কেমন হতে পারে সহজেই অনুমেয়।কবি তির্যক ভাষায় বলে ওঠেন, ‘অরণ্য নেই-রিজার্ভ ফরেস্ট ওই/ ল্যান্ডরোভারের তীব্র হর্নে কাঁপে।’ সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যা কিছু ঘটতে দেখি তার সবকিছুতেই ক্রুর রাজনীতি ঢুকে গেছে। যে কোনও বিষয় আর সাদা নয় বরং আমাদের ভ্রু কুঁচকে ওঠে ভেতরের রহস্যময়তা আঁচ করে। সাধারণ্যে যা ‘পরার্থপরতা’ অন্তরঙ্গ বিচারে উঠে আসে তার অন্য অর্থ। পরার্থপরতা কবিতার অর্থকে স্পষ্ট করে তোলেন তিনি এভাবে, ‘ভোট চাই/ ভোটের মূল্যে তাকে পাওয়া যাবে।’ উপরোক্ত ছয়টি কবিতার সারৎসারের পর এবার তার কয়েকটি কবিতার চমৎকার কিছু পঙক্তি তুলে আনি। ‘কমলা কিনতে গিয়ে বহুবছর আগে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে পেলাম।' কবিতাটির নাম ‘কমলা’। তিন পঙক্তি লেখার পর কবি বলেন, কমলার খোসা ছাড়াতেই সেই প্রিয় বন্ধু মুহূর্তেই অচেনা হয়ে গেল। আমাদের পারিবারিক পারিপার্শ্বিক নানা চরিত্র এরকমই। যেটুকু আকাশ ছিলো বুকে তার সবটুকু জুড়ে লিখেছি তোমার নাম যে-টুকু বাতাস ধরে বুকে তার সবটুকু জুড়ে নিয়েছি তোমার ঘ্রাণ। (তোমার অধিকারে : যে ছিল প্রাণের জরুরি, পৃ-৭) প্রেমের কবিতা হিসেবে এই ছবিটি চিরকালীন।আত্মনিষ্ঠ এই কবিতাটি আবেগতাড়িত কিন্তু জীবনেরই একটি বৃহৎ অংশ। জাহাঙ্গীর ফিরোজ বাংলা তিন ছন্দেই পারদর্শী। বিশেষ করে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ তাঁর হাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ মাত্রাবৃত্তে অজস্র কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্র পরবর্তী অনেক কবির হাতেই মাত্রাবৃত্ত প্রাণ পেয়েছে। জাহাঙ্গীর ফিরোজও যথারীতি। মাত্রাবৃত্তে রচিত তাঁর ‘আর এক বর্ষায়’ কবিতাটির কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করি : বরষা এসেছে কদম ফুটেছে ডালে আজ মনে পড়ে তার সেই রাঙা মুখ ঘনবরষার মুষল বৃষ্টি নামে; পরানে আমার প্রাচীন প্রথার ঢেউ। বিভিন্ন কবিতায় জাহাঙ্গীর ফিরোজ সাধুভাষা বিশেষ করে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন যা পাঠ করে মুহূর্তেই জীবনানন্দের ছবি ভেসে ওঠে। পাশাপাশি পুরোনো কিছু
শব্দ, যেমন- আঁখি, দোর, নীড়, নয়না ইত্যাদির ব্যবহার জীবনানন্দের চেহারাকে পোক্ত করে। কিন্তু পরক্ষণেই তার অমোঘ উচ্চারণ, ‘আগুন ও লাভায় হবে আমাদের আর একটি প্রভাত’ এই প্রতীতি জন্ম দেয় তিনি জীবনানন্দকে পাশে রেখে নিজের পথেই দ্বিধাহীনভাবে হেঁটে চলেছেন। তিনি স্মরণযোগ্য অনেক পঙক্তি রচনা করেছেন।এখানে কিছু পঙক্তি তুলে আনি: ক.কেন এই পাসপোর্ট পাসপোর্ট কাঁটাতার কাঁটাতার খেলা পৃথিবী আমার আমি হেঁটে যাবো। খ.এক বাস ভর্তি ছিল ফুল নেমে এলো একটি বকুল গ.শেষ রাতে পরিত্যক্ত ট্রেনে ঘুম ভেঙে বুঝিল সে জীবনের মানে। সবশেষে ‘জিজ্ঞাসা’ কবিতার ছোট চারটি পঙক্তি উদ্ধৃত করি। পাঠক, এই পঙক্তিগুলো বিশ্লেষণ করে আপনারাও জীবনের অর্থ খোঁজ করতে পারেন। 'সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে মনে হলো চাইনি সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে মনে হলো পাইনি।'







Comments
Post a Comment