ক বি অ ব শে ষ দা স
অবশেষ দাস
জন্ম:- দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দুটোতেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এছাড়া মাসকমিউনিকেশন নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিদ্যানগর কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক। প্রথম লেখা প্রকাশ 'দীপশিখা' পত্রিকার শারদ সংখ্যায়।
তাঁর কয়েকটি কবিতার বই :'মাটির ঘরের গল্প '( ২০০৪), 'কিশোরবেলা সোনার খাঁচায়' (২০১৪ ),'হাওয়ার নূপুর' (২০২০),' হ্যারিকেনের আলোটাও জ্যোৎস্না'( ২০২১),'বুকের ভেতর ময়ূরাক্ষী' (২০২১),'কিশোর কবিতাসংগ্রহ '(২০২১)। কবিতাচর্চার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের চর্চা সমানভাবে করে চলেছেন। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার ও সম্মান :সুধারানী রায় স্মৃতি পুরস্কার (২০০৪), বাসুদেব সরকার স্মৃতি পদক (২০০৬), রোটারি লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ১০০ ডায়মণ্ড গণসংবর্ধনা (২০০৮),পাঞ্চজন্য সাহিত্য পুরস্কার (২০১০), শতবার্ষিকী সাহিত্য সম্মাননা (২০১১), ডঃ রাধাকৃষ্ণন সম্মাননা (২০১৫), তেপান্তর পুরস্কার ২০১৮,ডি.পি.এস.সি. সাহিত্য সম্মাননা (২০১৮), আত্মজন সম্মাননা (২০১৯)
বিবেকানন্দ পুরস্কার (২০১৯) প্রভৃতি।
অনন্ত ভবতৃষ্ণার কবি জহর সেনমজুমদার
কবি-সাহিত্যিক অবশেষ দাস
খুব বেশিদিন হয়নি, কবি জহর সেনমজুমদারের কবিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ।একটানা বারো বছর তাঁর কবিতার সঙ্গে আত্মিক ওঠা-বসা।একটা ক্ষুধার্ত পাখি একটা একটা করে যেভাবে পোকা ধরে খায়, ঠিক সেভাবেই তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্ৰন্থের প্রতিটি কবিতা খুঁটে খুঁটে খেয়েছি। তৃষিত ময়ূরের মত নিরন্ন হয়ে আজও তাঁর কাব্যগ্ৰন্থের দরজায় গিয়ে দাঁড়াই।প্রতিটি কবিতার কাছে হাত পেতে থাকি।বলি, ভূমি দাও, ছায়া দাও,এক আঁজলা জল দাও। কবির কবিতা আমাকে বলে, আগামী কাব্যগ্ৰন্থের কাছে যাও, সব পাবে। আমার কানে যেন দ্বিরুচ্চারিত ব্যঞ্জনা হয়, সব পাবে, শব পাবে। তাঁর এক একটা কাব্যগ্ৰন্থ অন্ধকারাচ্ছন্ন নদী, বাঁকে বাঁকে মেয়েলি জ্যোৎস্না, পুরুষালি চরাচর। এক অত্যাশ্চর্য হেঁয়ালি পূর্ণ গতিপথ, কুণ্ডলিনীর সঞ্চরণ। অপার বিস্ময়ের শত সহস্র অভিমুখ। তাঁর কবিতায় যে জগৎ গড়ে উঠেছে, সেখানে এক জগজ্জননীকে খুঁজে পাওয়া যায়। পার্থিব জগতের বাসিন্দাদের প্রচণ্ড ঠোকাঠুকি থাকলেও কবি জহর সেনমজুমদারের কবিতার জগৎ ইন্দ্রিয়গম্য নয়, দৃশ্যমান নয়। নারী ও পুরুষের অগণিত অনুষঙ্গ তাঁর কবিতার উপকরণ হলেও অতিপ্রাকৃত পরাবাস্তবতার অপার্থিব দ্যোতনা তাঁর কবিতার আত্মভূমিতে প্রবিষ্ট হয়েছে। স্থির ও নিমগ্ন অনুধ্যানে তাঁর কবিতার জগৎ দ্বৈত বাস্তবতায় পরিপূর্ণ। কঞ্চির উপর বসে থাকা মাছরাঙা হিরণ্য সন্ন্যাসীর মত সাংকেতিক আহ্বানে ডুবে যেতে চায়। কবিও জড়ো জীবনের ক্লান্তি মাড়িয়ে সমস্ত মিথ্যে দুর্বলতাকে মুক্তির ঔষধ দিয়ে শাশ্বত সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে চান। গতিতত্ত্বের ধারাবাহিকতা কবির কাব্য-বীক্ষণে অতলান্তিক তৃষ্ণা সঞ্চার করেছে। গন্তব্য অনুসন্ধানী তৃষিত ময়ূর মরীচিকা-ভ্রান্তি কাটিয়ে এক নিগূঢ় তন্ত্র-সাধনার মধ্য দিয়ে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন। তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দ আত্মকেন্দ্রিক যন্ত্রণার মত জীবন্ত। অন্ধকার পৃথিবীর চৌকাঠ পেরিয়ে তাঁর অনিশ্চয়তা আলোর কাছে ভূমিষ্ঠ হতে চেয়েছে। বাংলা কবিতার মনোযোগী পাঠক এতদিনে লৌহ-কঠিন দৃঢ়তায় নিশ্চিত হয়েছেন, জহর সেনমজুমদার ব্যতিক্রমের ব্যতিক্রম, স্বতন্ত্র ঘরানার এক কবি। কোনো পরম্পরার আয়োজনে তাঁর কবিতা গা ভাসাতে চায়নি, কখনও। তিনি কতখানি পঠিত ও চর্চিত তা জরিপ করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। সম্পূর্ণ প্রচার বিমুখ এই কবি আধুনিক বাংলা কাব্যের আদিগন্ত পেরিয়ে নিঃশব্দে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন।
সাতের দশকের শেষ লগ্নে কবি জহর সেনমজুমদারের আত্মপ্রকাশ। নদী তার উৎস মুখ থেকে এগিয়ে বিচিত্র টালবাহানার মধ্য দিয়ে মোহনায় এসে পৌঁছায়। একজন সার্থক কবির এই মোহনাতে উত্তীর্ণ হওয়াটাই কবি জীবনের মূল মন্ত্র। বোধহয় কবি জহর সেনমজুমদার
প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'জনৈক ঈশ্বরের বাণী'(১৯৭৮) এই সাংকেতিক মোহনা পেরিয়েই লিখেছিলেন। এখন তিনি অজস্র মোহনার সামনে দাঁড়িয়ে আগামী বাংলা কবিতাকে শাসন করে চলেছেন। এই শাসনে না আছে তর্জনী, না আছে তরবারি, না আছে কোনো ঈর্ষা। তাঁর পূর্বসূরিও নেই, উত্তরসূরিও নেই। বিপন্নতা ও বিষণ্ণতার লাবণ্যে মাখামাখি মগ্নচেতনের কবি জহর সেনমজুমদার আত্মরমণের মধ্য দিয়ে পঞ্চভূতের সাক্ষাৎ দিয়েছেন। তাঁর কবিতার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি সমকালীন কাব্য-ভাষাকে স্পর্শ করেনি। তিনি অতি নিভৃতে গভীর অবচেতনের স্তব্ধতায় এক নতুন ভাষার জগৎ তৈরি করেছেন। কারো ব্যবহৃত ভাষা তাঁর কলমে ঠাঁই পায়নি। কারো দেখানো পথে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা অঙ্কুরিত হয়নি। বরফগলা জলে পুষ্ট নদীর মত তিনি আপন পথে এগিয়ে গিয়েছেন। সর্বগ্রাসী বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ভেতরে বসে তিনি এক আদালত খুলেছেন। ন্যায় বিচারের আদালত। সেখানে তিনি নিজেও বিচারাধীন। সমস্ত সংসার ও চরাচরকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিশ্ব দর্শন ও ব্রহ্মাণ্ড দর্শনের আয়োজন করেছেন।
কবি জহর সেনমজুমদারের 'তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন' (২০০৯) ক্ষীণ তনু বিশিষ্ট এক কাব্যগ্ৰন্থ।
প্রকাণ্ড একটা মাঠ পেরিয়ে আরেকটা প্রকাণ্ড মাঠে পা বাড়ানোর আগে যদি একটা সাঁকো থাকে, সেই সাঁকোটাই হয়ে ওঠে একটা মাইলস্টোন। কবির এই কাব্যগ্ৰন্থটি হৃদয় ও মস্তিষ্কের যূথবদ্ধতায় সর্বজনীন মাইলস্টোন হয়ে উঠেছে। লক্ষ্য করা যায় 'তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন' কাব্যগ্ৰন্থে কবির ভাষাবয়ন, বিন্যাস ও কাব্যিক রাগ এই পর্যায়ে নতুন নতুন বাঁক তৈরি করেছে। মস্তিষ্ক শাসিত মননমার্গের সমস্ত সীমাচিহ্ন ভেঙে দিয়ে তাঁর কবিতা গ্যালাক্সিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাব্যগ্ৰন্থের বিশেষ পাঁচটি কবিতা সামনে আনা যেতে পারে। তাহলে কবি সৃষ্ট স্বতন্ত্র জগৎকে খানিকটা অনুভব করা যাবে।
সামান্য এই মায়াবাদ
দুইদিকে দুটি গাছ। মাঝখানে আমাদের সামান্য এই মায়াবাদ
রেখে যাচ্ছি। মর্চে ধরা বন্দুকের ওপর তুমি তাহলে একাই
শুয়ে থাকো কাঠবিড়ালি। আমি যাই। আমার আর এই
খাঁচার ভেতর বঙ্গজননীর উদার আদিখ্যেতা ভালো লাগছে না।
বহুযুগ আগে, একটি নীল উট, আমিও পেয়েছিলাম
বহুযুগ আগে, একটি কানকাটা খরগোস, আমিও পেয়েছিলাম
পাহাড়ের উঁচু থেকে বাউলের নীড় ও পক্ষীরাজ খসে পড়ে
সোনালি জল, মস্তিষ্কের তাঁতঘরে বাচ্চাদের মত লাফায়,
গৃহপালিত আগুন আজকাল আর কলোনী নিয়ে কোনো ব্যর্থ
রচনা লিখতেই চায় না -- শুধু ঝড়ে উল্টে যায় দূরগামী
উড়ন্ত নন্দন, উল্টে যায় মেয়েমানুষের দীর্ঘ এই ছাতিমতলা
মর্চে ধরা বন্দুকের ওপর এইভাবে কতদিন শুয়ে থাকবে তুমি ?
বরং তুমিও এসো আমাদের অতিপ্রিয় কাঠবিড়ালি
দুইদিকে দুটি গাছ -- মাঝখানে আরো একবার
স্মৃতিভারাতুর শ্যামা মায়ের ভাস্কর্য তৈরি করে যাই
ঈশ্বরীর মুদ্রিত ইতিহাস
চাঁদ আর চন্দন নিয়ে ঈশ্বরের অভিসার শেষ হয়ে এলে একদিন
ঈশ্বরীর অন্ধকারে প্রবেশ করে শকুন। পৃথিবীর সর্বত্র তখন
উপভাষাভেদে শুধু অগ্রজ অন্ধকার মেয়েলি পাঠের ভিতর
মগ্ন হয়, স্তরীভূত প্রস্তরীভূত হয়। অন্ধকার, অন্ধকার, প্রতিটি
ইন্দ্রিয়ের ভাসমান বিষাদসিন্ধুতে কারা যেন মোমের মতন পোড়ে।
আমরা দেখি না কিছু : ওগো : আমরা বুঝিনা কিছু
নীচু হয়ে চুপিসারে অনুভব করি -- মশারির ভেতর একটার পর একটা
নানারঙের সাপ মন্দীভূত হয়েছে, প্রহেলিকা ও পাথেয় হয়েছে।
আতঙ্কে চিৎকার করি আমরা। চাই না অন্ধকার। চাই না অন্ধকার।
অর্থহীন সে চীৎকার। আমরাও একদিন গভীর গভীরতর ষড়যন্ত্রে
ঈশ্বরীর মুদ্রিত ইতিহাস থেকে, পৃথিবীর নশ্বর ছাপাখানা থেকে
বাদ পড়ি -- ছিটকে পড়ি -- উদ্ধারকার্যে কোন নৌকা আসে না
তাহলে কি ঈশ্বরীও উপভাষাভেদে বিষাদসিন্ধুতে ডুবে যায় ?
অলৌকিক লণ্ঠনের পাশে মৃদু মৃদু অশান্তির গল্প লেখা হয়,
কবিতাও হয়। আমরা হই না। আমরা এই জলচক্রে কিছুই হই না...
একটি রক্তাক্ত হাঁস
জল ও কুয়াশার আখ্যানে একটি চন্দ্রবোড়া সাপ সারাদিন মন দিয়ে
গৃহ নির্মাণ করে। আমাদের গৃহ, তোমাদের গৃহ। আমরা বোধিবৃন্দ,
ভাষা ও ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি। উচ্ছল মেয়েরা
গর্ভবতী মহিলা হবার পূর্বকালে ছোট্ট ফুটফুটে এক খরগোসকে
নিঃশব্দে প্রকৃতির চুল চিরুনি ও বাঁশি অর্পণ করে।
গোধূলির হলুদ রঙ চুষতে চুষতে এক সময় আমাদেরও লম্বা জিভে
ঘা হয়ে যায়। একটি অনাথ বালক, এই সময়, ঠিক এই সময়
মর্চে ধরা বন্দুকের উপর শুয়ে চিরকালীন বাঘিনীর পদশব্দ শোনে।
আমরা এই ছোট্ট ইতিহাস বাঁকুড়া বীরভূম জলপাইগুড়ির রহস্যময় বাঁশবাগানে
রেখে আসি। তারপর কুটীর শিল্প করি। দেখি : একটি রক্তাক্ত হাঁস,
তার ওপর কৃষ্ণচূড়া ঝরেছে, রাধাচূড়া রাধাচূড়া ঝরছে, যেন এক লাল রোমান্টিকতা,
সমকামী পতঙ্গেরাও এই সময় গভীরতর বেদনায় চুপ হয়ে যায়
ছিপ হাতে একটি শিশু কন্যা ক্রমশ খরা ও প্রলয় এড়িয়ে ধীরে অতি ধীরে
প্রাইমারি ইস্কুলের শাশ্বত প্রকৃতি হয়ে ওঠে। আমরা বোধিবৃন্দ,
এইসব পর্যবেক্ষণ করি। তারপর একদিন, সাইকেল চালাতে চালাতে
তিস্তা তোর্সা পদ্মার গভীরে চলে যাই। উচ্ছল মেয়েরা
সেইখানে কেবল হাজার হাজার বছর ধরে ভাষা ও ভয় তৈরি করে
তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন
একদিন আমার মতো তুমিও ঝিনুকের ভেতর ঝরা পালকের শান্ত
সমাহিত বিশ্ব পেয়ে যাবে। চেয়ে দেখবে : আদিবাসী মেয়েদের
পা থেকে বিন্দু বিন্দু জল টুপটাপ ঝরে পড়ছে গাছের ঘুঙুরে।
এইমাত্র বর্ষাকে হিংসা দিলাম, এইমাত্র বসন্তকে ঈর্ষা দিলাম,
অন্ধকারে একটি ব্যর্থ নাবিক, তবুও লন্ঠন হাতে মাকড়শা খোঁজে
বারবার উন্মাদের মতো সমুদ্র দেখলেই ঘুরে ঘুরে ঊর্মি ডাকে।
বলতে পারো এই উদাসীন মেঘপুঞ্জের ভেতর কার সঙ্গে কথা বলবো ?
কার সঙ্গে সারাদিন পৃথিবীর নীল মাথার ভেতর অবিশ্রাম ঘুরে বেড়াবো ?
চৈত্রের বাঁশপাতা মুখে নিয়ে ইঁদুরেরা চলমান জীবনের ভাস্কর্য তৈরি করে
আমি শুধু অবাধ্য লিরিক নিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে একদিন ঢুকে পড়ি
রক্তবর্ণ ঊষার আর্তনাদে, ঢুকে পড়ি বহু যুগ আগের কোনো নির্জন
ফুটফুটে সরস্বতীর আহত পদপ্রান্তের দীর্ঘশ্বাসে।
কুয়োর ভিতর ডুবন্ত গোধূলিসন্ধিকে কীভাবে উদ্ধার করবো আমি ?
দরিদ্র কাঙালের এই সামান্য কর্পূর কীভাবেই বা ধরে রাখবো আমি ?
ছিন্নমুণ্ডের উপর বসে শ্যামা মা সারাদিন শুধু পাখির বাসা দোলায়
আমি শুধু শব রাখি চন্দ্রভাগায়। মুখ বধির নীলপরীদের সঙ্গে যাবতীয়
অপকর্ম সেরে, তুমি শুধু একবার, তুলে নিও সামান্য এই আত্মনিবেদন,
তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন...
হে বন্ধু হে সখা
সারারাত অগ্নিতে পুরে ভোরবেলা উঠে দেখি কোথাও পোড়ার দাগ নেই
ঈশ্বরের চাঁদ ভেঙে নৌকা চলে, পুলকিত দেবযান চলে,
মশারির ভেতর অন্ধ পুরুষ স্থূল এক মহিলার কোলে মাথা রেখে
টর্চের ব্যাটারি ঠিক করে। ঈশ্বর ঈশ্বর বিষবৃক্ষে ঝুলে থাকে
বহুদিন আগে আমাদের হৃদয়ের মৃত্যু ঘটে গেছে। ঈশ্বর, ঈশ্বর,
রান্নাঘরের মৃত আরশোলা উল্টে গিয়ে ক্রমাগত উপদেশ দেয়
ঈশ্বর, ঈশ্বর, কোথা যাই, কেন যাই, বারবার
বিষন্ন নদীর ওপর আমি সেই বিন্দুবৎ ব্যর্থ টিয়াপাখি
ধানক্ষেতে ধারালো কাস্তে দেখে বুঝতে পারি : সারারাত
অগ্নিতে পুড়েও আমি বেঁচে আছি ঠিক ঘরপোড়া মানুষের মতো
পাইনবনের ফাঁক দিয়ে বহুবার সূর্যাস্ত ঘটেছে।
আত্মহত্যাও এক ধরণের নিশ্চুপ সাধনা। ফিরে এসো
ঘুমন্ত মহিলাদের গায়ে কেন তুমি বারবার চিতাবাঘ
একে দিচ্ছো ? কীট পড়ে কীট পড়ে
মহৎ প্রপিতামহদের হালিশহরে। বৌবাচ্চাসহ এই রাত্রে
ধুনা ও তার্পিন জন্মিল। ময়ূরের ছদ্মবেশে ঝাঁপ দাও
মুক্ত ধানক্ষেতে। সহবাসসুখ করো আমাদিগের সাথে।
কেন তুমি বারবার প্রেমিকের সাইকেলে হাত-কাটা
পা-কাটা পৃথিবী বসিয়েছো ? তোমার এই দাঙ্গা
তোমার এই মন্বন্তর তোমার এই অলিখিত দেশভাগ
আমাদের ক্লান্ত করে। ক্লান্ত ক্লান্ত করে।
হে বন্ধু হে সখা। শোনো একবার শোনো
আমি কৃতি, কারুকৃতি, ক্লান্তি মুছে মহাব্যোমে শিল্পসৃষ্টি করি...
কাঠবিড়ালি, নীল উট, বঙ্গজননী, শ্যামা মায়ের ভাস্কর্য প্রভৃতি অনুষঙ্গ যে মায়াবাদে আচ্ছন্ন করে দেয়, তার ইতিবৃত্ত বুভুক্ষু সন্তানের শোক ও কৃপা লাভের আদিগন্তে কবির ইতিহাস চেতনা তরান্বিত করে। পাহাড়ের শীর্ষ ভূমি থেকে বাউলের নীড় ও পক্ষীরাজ সোনালি জলে এসে খসে পড়ে; সীমাহীন কল্পনার তাঁতঘরে কবির অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত মুগ্ধতা ও বিস্ময়ে আবিষ্ট করে রাখে। আবার, ঈশ্বরের অভিসার শেষে চাঁদ আর চন্দন সহযোগে শকুনকে ঈশ্বরীয় অন্ধকারে প্রবেশ করতে দেখা যায় তাঁর কবিতায়। অলৌকিক লণ্ঠন, পৃথিবীর নশ্বর ছাপাখানা,
জলচক্র আলোর উৎসের সন্ধান দেয়, কবির কাব্য সাধনার অক্ষরবৃত্তীয় দিগন্তে অলৌকিক লণ্ঠন, জলচক্র একদিন শান্ত হ্যারিকেন ও ভবচক্রে উত্তীর্ণ হয়। মনে হয়েছে,তিনি সারাজীবন ধরে একটি কবিতা লিখেছেন, একটি কাব্যগ্ৰন্থ লিখেছেন, সম্পূর্ণ নতুন এক গ্যালাক্সি নির্মাণ করেছেন। তার দিকে দিকে অজস্র নক্ষত্র, গ্ৰহ, গ্ৰহানুপুঞ্জের মত স্বতন্ত্র ধারায় উৎসারিত হয়েছে তাঁর এক একটি কালজয়ী কাব্যগ্ৰন্থ। এই একের মধ্যেই জগৎ ও জীবনের সহস্র সহস্র শ্যামা ও কায়া সাধনার বসবাস। তাঁর কবিতার বাঁকে বাঁকে জেগে উঠেছে শাক্ত সাধনার মন্দির, একান্ন পীঠ, একের পর এক তীর্থ, সর্বজয়ী মানবতার নভোমণ্ডল, "ঝরা পালকের শান্ত সমাহিত বিশ্ব", তৃষিত হৃদয়ের ভবচক্র। কবির হাতের শব্দ পরমব্রহ্ম মহাকালী হয়ে মহাকালকে নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যত হয়েছে।এই যন্ত্র সাধনার যুগে শব্দের জাগ্রত পীঠে বসে তিনি কাব্যের তন্ত্র-সাধনা করেছেন। জগতের কোনো কবিতা, কোনো কাব্যগ্ৰন্থ সেই অর্থে বহুপঠিত ও চর্চিত হয় না। আদি কাব্যের আত্মা ও পরমাত্মা সে প্রত্যাশাও রাখে না। একজন জাত কবি হিসাবে কবি জহর সেনমজুমদার তৃষিত ময়ূর হয়ে শ্যামা চরণে আশ্রয় ও প্রশ্রয় চেয়েছেন, আর কিছুই চাননি। কবি রামপ্রসাদ উদাত্ত ভাষায় স্বীকার করেছিলেন, মন্ত্র তন্ত্র তিনি কিছুই জানেন না। একজন ব্রাহ্মণ দেবীকে আরাধনার জন্য কেবল জল-পুষ্প, মন্ত্র নয় আরো অজস্র উপকরণের উপর আস্থা রাখেন। মাতৃকৃপা লাভের জন্যই তাঁর সমস্ত আয়োজন। এখানেও কবি জহর কবিতার ব্যাঘ্রাসনে বসে মাতৃ বন্দনা করেছেন। কবিতা দিয়েই অন্তরের শ্যামা ভাবকে পূজা করেছেন,রাধা ভাবকে আরাধনা করেছেন। কাব্যের শ্মশানে বসে তিনি সমারূঢ়, তিনিই বিভূতিভূষণ।
সহজিয়া সাধকদের রচনা সৃজ্যমান বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। অপরিণত বাংলাতেই তাঁরা পদগুলি রচনা করেছিলেন। অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য, সন্ধ্যা বা আলো-আঁধারি সেই ভাষা। 'তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন'-এর ভাষা সূক্ষ্ম ও ইঙ্গিতবাহী, বড়ো বেশি পরিণত, তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার। তন্ত্র-সঙ্গ ও জীবন-সঙ্গের অপরূপত্ব সেতু বন্ধনে তৃষিতের নিবেদন কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে। কবির যাপন শহরে, আর শিকড় গ্ৰামে। ছিন্নমূল একাকীত্বের যন্ত্রণা তাঁর এই কাব্যগ্ৰন্থ। গূঢ় ও জটিল সংকেতের মধ্য দিয়ে সে যন্ত্রণা বিধৃত হয়েছে। কবির প্রত্যেকটি কবিতা এক এক দিনের তন্ত্রসাধনার মত উচ্চারিত। রক্ত, মাংস, মেদ, মজ্জা, হাড়, হাহাকার, আর্তনাদ কোনোকিছুই তাঁর তন্ত্রসাধনায় উপেক্ষিত নয়। আত্মপ্রচার ও আত্ম- অহমিকার ছায়াতে কখনও তিনি পা বাড়াননি, তিনি অনন্তে হেঁটে চলেছেন, অখণ্ডে ডুবে গিয়েছেন। 'তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন'-এর প্রত্যেকটি কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে রহস্যঘন অনুভব সীমা থেকে অসীমে ছড়িয়ে পড়েছে।
'ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে' (২০১৫) কাব্যগ্ৰন্থের উৎসর্গের পাতায় বিপন্ন বিস্ময় প্রসন্ন হৃদয়ে বলে উঠেছে, "গ্রাম থেকে শহর; শহর থেকে দেশ; দেশ থেকে ভবচক্র/যেখানে যত ভাঙা ভাঙা ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তুপ আছে/নির্জন, পরিত্যক্ত, রহস্যময় প্রহেলিকাধিক/সবাইকে, তাদের সবাইকে"।
ভবচক্রে দাঁড়িয়ে জহর-দ্যুতি বৈকুণ্ঠ ও শ্মশানকে এক তারে বেঁধেছেন। মহাত্মা কবি জহর ভবচক্রে এক ব্যতিক্রমী দ্যোতনায় বিচরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কবিতার জগৎকে যে রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধে সাজিয়েছিলেন, তা থেকে কবি জীবনানন্দ বহু দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কৃত কবিতার ভুবন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। অবসাদ ও বিষাদের ছায়া পরিবেষ্টিত ইমেজের ব্যবহারে জীবনানন্দ অন্যধারার জন্ম দিয়েছিলেন। কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতার নিঃশব্দ আক্রমণকারী। আর কবি জহর সেনমজুমদার বাংলা কবিতার পালাবদলে এক নিঃশব্দ ঘাতক হয়ে উঠেছেন। কবি জহরের এক হাতে রাধা ভাব আর অন্য হাতে শ্যামা ভাব, এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তিনি জীবনানন্দের জগৎ ছাড়িয়ে গেছেন। উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীক সৃজন, রঙের ব্যবহার, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উপলব্ধির সমন্বয়ে জীবনানন্দ গড়ে তুলেছেন, অপ্রতিম কবি ভাষা। তাঁর কবিতায় পঞ্চ ইন্দ্রিয় সমভাবে সপ্রতিভ। কবি জহর সেনমজুমদারের কবিতাতেও দেশজ ও গ্ৰামীণ উপাদানে চিত্রকল্পের অবিসংবাদিত ব্যবহার দৃষ্টিগোচর হয়। 'ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে' কাব্যগ্ৰন্থে তিনি যেন কবিতার ঈশ্বর হয়ে উঠেছেন। কবিতার জীবনদেবতা হয়ে বাংলার আবহমান জীবন প্রবাহকে ইমেজের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিয়েছেন। একজন মেধাবী মননের অধিকারী হিসাবে তাঁর হাতে নির্মিত হয়েছে দ্বৈত বাস্তবতা। 'ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে' কাব্যগ্ৰন্থের শরীর জুড়ে বিধৃত হয়েছে বৈষ্ণব ভাবনা ও শাক্ত ভাবনার ভারসাম্য। জবা গাছ ও জবা ফুল অসামান্য প্রতীকি ব্যঞ্জনায় ভবচক্রের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। রহস্যময় প্রকৃতির কলকাকলি, অনার্য সভ্যতার প্রতিধ্বনি, কৃষিভিত্তিক সমাজ-জীবন, জল, অন্ধকার সবকিছু মিলে মিশে এক অনন্ত যাত্রা এই কাব্যগ্ৰন্থ। ভবচক্রের অতলান্তিক গহনে প্রবেশ করতে হলে দু-চারটি কবিতার নিগূঢ় স্পন্দনে কান পাতা প্রয়োজন।
সিঁড়ি
লেখাগুলি অতি শান্ত; যাবতীয় ক্রিয়াকর্মশেষে
ভেসে ওঠে, ডুবে যায়, এই মৃত দেশে
অগ্নিদগ্ধ উন্মাদিনী যেন ঐশী খুঁজে
মহাশূন্যে উড়ে যায়; শুধু চক্ষু বুজে
আমি তার অতি ভক্ত; গৃহ থেকে চাঁদে
ধানসিঁড়ি পড়ে আছে ভবচক্র ফাঁদে
তোমাদের কৃষিক্ষেতে
তোমাদের কৃষিক্ষেতে শালিকের ছেঁড়া ঠ্যাং ধান আর খড়ে কেঁদে ওঠে
পড়ে আছে ঘিলুভাণ্ড, মাথাভর্তি জলপথে, ছোট ছোট রক্তজবা ফোটে
তুমি যদি উড়ে আসো, মর্মরিত শিহরিত, এইখানে এই শঙ্খচূড়ে
আমিও ময়ূর হবো, ভূমির ভিতরে যাবো, গোধূলির পড়ন্ত রোদ্দুরে
নুন আর চুমো নিয়ে, বিষ আর ব্রীহি নিয়ে, শত শত ব্যর্থ পদছাপ
মূঢ় তুমি মূঢ় আমি, যুগে যুগে ছুঁয়ে যাবো মেঘাবৃত অন্ধকার পাপ
মেঘাবৃত অন্ধকার পাপ, মেঘাবৃত অন্ধকার পাপ
ভবচক্র
ভেঙে যায় ভবচক্র; ভেঙে যায় ভবচক্র; গৃহ থেকে শ্বাসে
অলৌকিক হরিণীরা বারবার ঘুরে ঘুরে পদতলে আসে
ষড়রিপু কেঁদেছিল; একদিন কেঁদেছিল; সেই কান্না
মাতৃগর্ভে সারারাত মাতৃগর্ভে সারারাত হয় রান্না
অগ্নিদগ্ধ উন্মাদিনী কালরূপে ক্রমাগত জল নিয়ে আসে
রক্ত পড়ে টুপটাপ; বীর্য পড়ে টুপটাপ; আমাদের গৃহ থেকে শ্বাসে
দাঁড়
ভেঙে পড়ে দাঁড় ও নৌকা; সৎকার শেষ; বলে উঠি --আবার আসবেন;
জগত ও যোনির ভেতর জ্বলে ওঠে অতিশয় শান্ত হ্যারিকেন
নিছক প্রকৃতি বর্ণনার কবি হয়ে উঠতে চাননি তিনি। স্থানিক প্রকৃতি বর্ণনায় সমকালের অনেক কবির মধ্যে গভীর মনোযোগ দেখা গিয়েছে। বরং তিনি প্রকৃতিকে এক আশ্চর্য দ্যোতনায় মহিমান্বিত করেছেন। কবিতার অন্তরালে যে স্বর রয়েছে, প্রকৃতিকে তার পরিপূরক হিসাবে কবিতায় গেঁথেছেন। ভবচক্রের প্রায় প্রত্যেকটি কবিতায় রহস্যময় প্রকৃতির আধারে আধারিত। কবির স্বপ্নের ধানসিড়ি ভবচক্র ফাঁদে পড়ে থাকতে দেখেছেন। গভীর যন্ত্রণায় ক্ষত বিক্ষত কবির রক্তাক্ত হৃদয় ভবচক্রের ভূমি থেকে শূন্য, শুরু থেকে শেষ অবধি অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। কবি কত নিঁখুতভাবে পাপ, অন্ধকার ও মেঘকে এক সুতোতে বেঁধেছেন। শালিকের ছেঁড়া ঠ্যাং এর কান্না মনোযোগী পাঠকের চোখেও জল এনে দেয়। চোর এসে সন্ধ্যা জল নিয়ে গেছে। সান্ধ্য তারাপিঠে বড়ো ধীর লয়ে চাঁদ উঠেছে। গৃহস্থের ভিটে শুধু ভেঙে যায় না, পুঁজ, রক্ত, বনবীথি সব ভেঙে যায়। পাঠচক্র, ভবচক্র সব ভেঙে যায়। "ভেঙে পড়া দাঁড় ও নৌকা"-র অবশেষ
"অতিশয় শান্ত হ্যারিকেন"-এর জ্বলে ওঠার মধ্য দিয়ে কবির কাব্যগ্ৰন্থের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু ভবচক্রের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে দার্শনিক কবি পরিপূর্ণ নবজাগরণের সন্ধান করেছেন। কবির চির চলিষ্ণু আধুনিকতা চেতনা প্রবাহ ও যাদুবাস্তবতার ছায়া অনুসরণ করলেও তিনি আপন মনোজগতে স্থিতধি, স্বতন্ত্র ঐতিহ্য বোধে অবিচল ও সংকল্পবদ্ধ। জাগতিক ও মহাজাগতিক আলোর উদ্ভাসে তাঁর কবিতার জগৎ জীবনানন্দীয় গ্যালাক্সি ভেঙে আর এক অভিনব গ্যালাক্সি নির্মাণ করেছে, যাকে জহর-দ্যুতির গ্যালাক্সি বলা যায়। জন্ম ও মৃত্যু দুজনকেই তিনি পরম মমত্বে লালন করেছেন। প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের যে মৌলিক ব্যবধান তার কেন্দ্রে রয়েছে সৃষ্টিতত্ত্ব, যৌনতা, ট্র্যাজেডি। 'ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে' এই বিষয়গুলি বিশিষ্ট সজীবতায় উন্মোচিত হয়েছে। যৌনতার চরম বহিঃপ্রকাশ এই কাব্যগ্ৰন্থের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। দোলযাত্রা, রং ও আবির ঠিক যেভাবে দেহ ও মনে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক সেভাবেই ভবচক্রের পাতায় পাতায় গভীর যৌনতাবোধ ঝরে পড়েছে। মানুষের যৌনতা নয়, মানবের যৌনতাকে তিনি খুঁটে খুঁটে দেখিয়েছেন, তন্ত্রসাধনার নিগূঢ় রহস্যের মত সেই অনুসন্ধান।
কবি জহর-দ্যুতির বর্ণচ্ছটায় বিভিন্ন গদ্যে, সাক্ষাৎকারে এবং বক্তৃতায় তিনি জানিয়েছেন, "আসলে আমি এই নাগরিক যন্ত্রজীবনের অর্থহীন প্রতিযোগিতা এবং অর্থহীন কোলাহলের কেউ নই; একদিন গ্রাম থেকে এই
যক্ষপুরীর গহ্বরে এসে ঢুকে পড়েছিলাম -- তারপর আর বেরোতেই পারলাম না -- প্রতিমুহূর্তেই ভেতরে ভেতরে তাই চাপ চাপ একটা অন্ধকার যন্ত্রণা অনুভব করি -- কোথায় গেল আমার সেই ইছামতী নদী -- বাদুড়িয়া শ্মশান কিংবা ভাঙা ভাঙা জীর্ণ ধ্বংসস্তূপ -- যার ভেতর একটা শব্দহীন নীরবতা ছিল আর নীরবতার ভেতর কলকা ও কল্কে আঁকতে আঁকতে আমি শুধু কথা বলেছিলাম আমার সঙ্গেই কিংবা ফুটো দেয়ালের ঝুলে থাকা টিকটিকি মাকড়সার সঙ্গে -- কোথায় গেল তারা সব কোথায় গেল ? এই শহরের কোথাও তো এই নীরব আত্মচারিতার সুযোগ ও সম্মোহন নেই; এখানে তাই আছি -- শুধু কোনরকমে গ্রাসাচ্ছাদনে আছি -- যখনই একটু চিরিক মারে মাথা -- নিউরনের ধাক্কা তৈরি হয় -- তৎক্ষণাৎ পালাই, ছুটে যাই, আস্তে গিয়ে বসে পড়ি গাছনদীর নিঃশব্দ জীবনে..."
বলা বাহুল্য, তিনি কখনও কোথাও ধরা দিতে চাননি। যখনই কোনো সংকীর্ণতা ও বৃত্ত তাঁকে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে, তখনই তিনি পালিয়ে গিয়েছেন। জল, আগুন, বাতাসের মতই তিনি পলাতক, অধরা; অসীমের পূজারী। জন্মের পর থেকেই তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন। নীরব আত্মচারিতার সুযোগ ও সম্মোহন তাঁকে আজীবন ডাকছে। ইছামতী নদী, বাদুরিয়া শ্মশান, ভাঙা ভাঙা জীর্ণ ধ্বংসস্তূপ নীরব আত্মচারিতা ও সম্মোহনের সূতিকাগার মত পরিবর্তন ও পথ পরিবর্তন কবির আবাল্য প্রণয়ের হাতিয়ার। অন্য সব ছেলেমেয়েদের মত ইস্কুলের দিকে রওনা হয়েও প্রায় কোনোদিন স্কুলে যেতেন না, বাল্যকালে। আর যে-কদিন যেতেন, মনের পাখিকে জোর পূর্বক খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার ঘটনা না ঘটলে তা কোনো ভাবেই সম্ভব হত না। স্কুলে না গিয়ে তিনি যেতেন কোথায়! তার উত্তরে বলব, নীরব আত্মচারিতার সুযোগ ও সম্মোহন সন্ধানে। সঙ্গীদের অগোচরে হাতছানি দিয়ে ডাকা যে কোনো কাঁচা মাটির ঢালু পথ ধরে গাছপালার আড়ালে জঙ্গলের আলোছায়ার মধ্যে ঢুকে পড়তেন। জনমানব শূন্য ভাঙা ভাঙা বাড়ি বা দালানকোঠা পেলে সেখানেও তিনি আত্মগোপন করতেন, এ সব কিছুই ছিল তাঁর নিভৃত প্রাণের বন্ধু। পারলে তিনি পঞ্চভূতের আড়ালে গিয়েও আত্মগোপন করতেন। কবি জহর সেনমজুমদারের আত্মচারিতার সীমাহীন আহ্বান মানুষ জহর সেনমজুমদারকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। আজন্ম অনুসন্ধানী কবি গভীর ও নিবিড় সততার সঙ্গে ভবচক্রে তা তুলে ধরেছেন। কোনো কিছুই তাঁর বানিয়ে তোলা নয়, ইনিয়ে বিনিয়ে বলা নয়। শানিত ও সহজাত তাঁর উচ্চারণ। আজও তিনি বর্ণ শূন্য, গন্ধ শূন্য, জীবন শূন্য, প্রেম শূন্য জনাকীর্ণ শহরের চক্রব্যূহ থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে যেতে চান। জন্মের পর থেকেই তিনি দৌড়াচ্ছেন। সে দৌড় আজও থামেনি। তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন। বলাই, ফটিক, অপুকে আমরা চিনি। কবি জহরের ছেলেবেলা, প্রাক-পূর্ব বড়োবেলা, বড়োবেলা কোনোটাই আমরা চিনি না, হয়তোবা চিনেও চিনতে পারিনি, বুঝেও বুঝতে পারিনি চা-চক্রের জহর সেনমজুমদারের ভবচক্রের অভিযাত্রা।
'ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে' কাব্যগ্ৰন্থে মাতৃগর্ভ, মাতৃজঠরের কথা বারবার এসেছে। সৃষ্টির আদিতে যে জল বৃত্তান্ত রয়েছে, তারই এক আত্মবোধন মাতৃগর্ভের জল। কবি গভীর মনোযোগের সঙ্গে সেই সজলতার সাধনা করেছেন।
"যিনি ব্রহ্ম হইতে তৃণ পর্যন্ত ভূতকে নিজের আত্মাতেই দর্শন করেন, অর্থাৎ আত্মার অতিরিক্ত বা আত্মা হইতে পৃথক দেখেন না, এবং সমস্ত ভূতের মধ্যে নিজের আত্মাকেই দর্শন করেন, তিনি এই প্রকার দর্শনের পর আর কাহারও নিকট হইতে আপনাকে গোপন করিতে ইচ্ছে করেন না।" এই দীর্ঘ অভিযাত্রার সাংকেতিকতায় কবির কাব্যগ্ৰন্থের সর্বশেষ বিশেষণযুক্ত শব্দ "শান্ত হ্যারিকেন"। তুরীয় বোধ ও দর্শনকে ছাড়িয়ে এই শান্ত হ্যারিকেনের জ্বলে উঠতে দেখা যায়। কবি জহর সেনমজুমদারের দীর্ঘ জীবন ধরে কাব্য সাধনার জয় সেখানেই ঘোষিত হয়েছে। জীবনানন্দ পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলা কবিতার সর্বশ্রেষ্ঠ নক্ষত্রের শিরোপা হয়তো সন্ধ্যার মত ধীর পায়ে তাঁর কপালেই প্রজ্জ্বলিত হবে। হয়তোবা কবি বন্দনা কবিতার বন্দনায় কবি জহর সেনমজুমদার ও তাঁর কবিতার সীমানা দেশকাল পেরিয়ে সারা বিশ্বে নন্দিত হবে। তাঁর অবিসংবাদী প্রতিভা, ব্যতিক্রমী মেধা ও মননের কাছে আমাদের অন্তর-ঘনিষ্ঠ প্রত্যাশা। কবি পুনর্জন্ম বা পরজন্মে বিশ্বাস করেন না। তবুও যদি পরজন্ম বলে কিছু থাকে, তাহলেও তিনি ফিরে এসে কবিতা লিখতে চেয়েছেন। কবি বলেছেন, "যদি সত্যি সত্যি পুনর্জন্ম বা পরজন্ম থাকে--তাহলে ফিরে এসে আমি জোঁকেদের ভাষায় কবিতা লিখতে চাই, কেন্নোদের ভাষায় কবিতা লিখতে চাই, কেঁচোদের ভাষায় কবিতা লিখতে চাই..." তাঁর এই চাওয়ার মধ্যে বিরাজমান অমোঘ ভবতৃষ্ণা, চরচরাব্যাপী মাতৃচরণ ও শরণাগত হওয়ার অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।







Comments
Post a Comment